সমন্বয় দাখিলা, Adjusting Entries

সমন্বয় দাখিলা

Adjusting entries

কারবারের সঠিক আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করার জন্য এবং হিসাববিজ্ঞানের আয় স্বীকৃতি নীতি ও মিলকরণ নীতির পরিপূর্ণ অনুসরণ করার জন্য কারবারের হিসাবকাল শেষে যে জাবেদা দাখিলা দেওয়া হয় তাকে সমন্বয় দাখিলা বলে। সমন্বয় দাখিলার মাধ্যমে হিসাবকাল শেষে রেওয়ামিলের হিসাবসমূহের জেরকে হালনাগাদ করা হয়। Wegandt, Kimmel and Kieso-এর মতে, “adjusting entries ensure that the revenue recognition and matching principles are followed”।

কারবারের সঠিক আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করার জন্যই সমন্বয় জাবেদা দিতে হয়। রেওয়ামিলে সমস্ত হিসাবের হালনাগাদকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বিষয় প্রতিফলিত হয় না। কারণ-

i. কিছু কিছু ঘটনা দৈনন্দিন ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ হয় না, যেমন সাপ্লাইজের ব্যবহার।

ii. কিছু কিছু ব্যয়কে লেনদেন সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে ব্যয় হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। কারণ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে সেগুলো নিঃশেষিত হয়। যেমন- অগ্রিম প্রদত্ত ভাড়া, বীমা খরচ, বিজ্ঞাপন ব্যয়।

iii. কিছু কিছু লেনদেন অলিখিত রয়ে যায়। যেমন- ইউটিলিটি বা উপযোগের বিল মাস শেষে বা হিসাবকাল শেষে পাওয়া যায়।

এ সব কারণেই সমন্বয় জাবেদার প্রয়োজন পড়ে। প্রতিবার আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পূর্বে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সমন্বয় জাবেদা দিতে হয়। ‌

সমন্বয় জাবেদার প্রকারভেদ

Classification of adjusting entries

সমন্বয় দাখিলা দুই ধরনের হতে পারে, যথা- অগ্রিম দফাসমূহ (deferrals) এবং বকেয়া দফাসমূহ (accruals)। 

সমন্বয় দাখিলা (adjusting entries):

অগ্রিম দফাসমূহ (deferrals) এবং বকেয়া দফাসমূহ (accruals)

অগ্রিম ব্যয়সমূহ, অগ্রিম আয়সমূহ এবং বকেয়া ব্যয়সমূহ,  বকেয়া আয়সমূহ। 

• অগ্রিম দফাসমূহ (deferrals)

১. অগ্রিম প্রদত্ত ব্যয় (prepaid expense): যে ব্যয়ের জন্য নগদ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে কিন্তু তা নিঃশেষিত হয়নি, সে ব্যয়কে অগ্রিম প্রদত্ত ব্যয় বলে। এটি প্রতিষ্ঠানের একটি চলতি সম্পদ।

২. অগ্রিম আয় (unearned revenue): যে আয়ের জন্য নগদ প্রাপ্তি ঘটেছে কিন্তু এর বিপক্ষে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করা হয়নি, তাকে অগ্রিম বা অনুপার্জিত আয় বলে। এটি প্রতিষ্ঠানের একটি চলতি দায়।

• বকেয়া দফাসমূহ (accruals)

১. বকেয়া ব্যয় (accrued expenses): যে ব্যয় সংঘটিত হয়েছে কিন্তু পরিশোধ করা হয়নি, তাকে বকেয়া ব্যয় বলে। এটি প্রতিষ্ঠানের একটি চলতি দায়।

২. বকেয়া আয় (accrued revenue): যে আয় অর্জিত হয়েছে কিন্তু নগদ অর্থ পাওয়া যায়নি, তাকে বকেয়া আয় বা প্রাপ্য আয় বলে। এটি প্রতিষ্ঠান একটি চলতি সম্পদ।

সমন্বয় জাবেদাসমূহ

Adjusting entries

লেনদেন সংগঠিত হওয়ার সাথে সাথে যে দাখিলা দিয়ে হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করা হয় তা হলো জাবেদা দাখিলা (journal entry)। অন্যদিকে, লেনদেন লিপিবদ্ধ করার পরে সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে আর্থিক বিবরণীতে যে প্রভাব পড়ে তার স্বীকৃতি দিয়ে যে দাখিলা দেওয়া হয় তা-ই সমন্বয় দাখিলা। নিচের সমন্বয় দাখিলাগুলো দেওয়া হলো-

১. ব্যয় বকেয়া হলে-

             সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসাব ডেবিট

             বকেয়া ব্যয় হিসাব ক্রেডিট

২. অগ্রিম ব্যয় নিঃশেষিত হলে-

               সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসাব ডেবিট

               অগ্রিম ব্যয় হিসাব ক্রেডিট

৩. আয় বকেয়া বা প্রাপ্য হলে-

                প্রাপ্য হিসাব ডেবিট

                ‌‌সংশ্লিষ্ট আয় হিসাব ক্রেডিট

৪. অনুপার্জিত বা অগ্রিম আয় উপার্জিত হলে-

                 অনুপার্জিত আয় হিসাব ডেবিট

                 সংশ্লিষ্ট আয় হিসাব ক্রেডিট

৫. কোন ব্যয় যা রেওয়ামিলে খরচ হিসেবে লেখা ছিল কিন্তু ঐ ব্যয়ের কিছু অংশ নিঃশেষিত না হয়ে সম্পদ হিসেবে রয়ে গেলে ঐ অনিঃশেষিত সম্পদ অংশের সমন্বয় দাখিলা দিতে হবে।

i. সমন্বয়ে আছে, সাপ্লাইজ খরচ ৫,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে বলা আছে, সাপ্লাইজ খরচ ৬,০০০ টাকা।)

                 সাপ্লাইজ ডেবিট ১,০০০/-

                 সাপ্লাইজ খরচ ক্রেডিট ১,০০০/-

ii. সমন্বয়ে আছে, সাধারণ খরচ ৫,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে বলা আছে, সাধারণ খরচ ৭,০০০ টাকা)

                অগ্রিম সাধারণ খরচ হিসাব ডেবিট ২,০০০/-

                সাধারণ খরচ হিসাব ক্রেডিট ২,০০০/-

iii. সমন্বয়ে আছে, ভাড়া নিঃশেষ হয়েছে ৪,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, ভাড়া খরচ ৫,০০০ টাকা)

               অগ্রিম ভাড়া হিসাব ডেবিট ১,০০০/-

               ভাড়া খরচ হিসাব ক্রেডিট ১,০০০/-

iv. সমন্বয়ে আছে, ভাড়া অনিঃশেষিত আছে ২,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, ভাড়া খরচ ৫,০০০ টাকা)

               অগ্রিম ভাড়া খরচ হিসাব ডেবিট ২,০০০/-

                ভাড়া খরচ হিসাব ক্রেডিট ২,০০০/-

৬. কোন ব্যয় রেওয়ামিলের সম্পদ হিসেবে থাকলে এবং তার কিছু অংশ নিঃশেষিত হয়ে গেলে বা খরচ হয়ে গেলে ঐ নিঃশেষিত খরচ অংশটুকুর জাবেদা দিতে হবে।

i. সমন্বয়ে আছে, সাপ্লাইজ খরচ ৫,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, সাপ্লাইজ ৬,০০০ টাকা।)

                 সাপ্লাইজ খরচ হিসাব ডেবিট ৫,০০০/-

                 সাপ্লাইজ হিসাব ক্রেডিট ৫,০০০/-

ii. সমন্বয়ে আছে, সাধারণ খরচ ৫,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, অগ্রিম সাধারণ খরচ ৭,০০০ টাকা।)

                সাধারণ খরচ হিসাব ডেবিট ৫,০০০/-

                অগ্রিম সাধারণ খরচ হিসাব ক্রেডিট ৫,০০০/-

iii. ভাড়া অনিঃশেষিত রয়েছে ৩,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, অগ্রিম ভাড়া ৫,০০০ টাকা।)

               ভাড়া খরচ হিসাব ডেবিট ২,০০০/-

               অগ্রিম ভাড়া খরচ ক্রেডিট ২,০০০/-

iv. সমন্বয়ে আছে, ভাড়া নিঃশেষিত হয়েছে ৪,০০০ টাকা। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, অগ্রিম ভাড়া ৫,০০০ টাকা)

                ভাড়া খরচ হিসাব ডেবিট ৪,০০০/-

                অগ্রিম ভাড়া হিসাব ক্রেডিট ৪,০০০/-

৭. অবচয়ের সমন্বয় জাবেদা-

             অবচয় খরচ ডেবিট 

             পুঞ্জিভূত অবচয়, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি ক্রেডিট

৮. অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি ধার্য করতে বললে-

             অনাদায়ী পাওনা খরচ হিসাব ডেবিট

             অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি হিসাব ক্রেডিট

৯. অনাদায়ী পাওনার অবলোপন করতে বললে-

i. রেওয়ামিলে পুরাতন অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি থাকলে সঞ্চিতি পদ্ধতি ব্যবহার করা করে সমন্বয় দাখিলা দিতে হবে-

             অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি হিসাব ডেবিট

             প্রাপ্য হিসাব ক্রেডিট।

ii. রেওয়ামিলে পুরাতন অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি না থাকলে সরাসরি অবলোপন পদ্ধতিতে সমন্বয় জাবেদা দাখিলা দিতে হবে-

             অনাদায়ী পাওনা খরচ হিসাব ডেবিট

             প্রাপ্য হিসাব ক্রেডিট

১০. রেওয়ামিলে বিলম্বিত বিজ্ঞাপন খরচ থাকলে অবলোপন অংশটুকুর সমন্বয় জাবেদা দিতে হবে আর রেওয়ামিলে বিজ্ঞাপন খরচ থাকলে বিলম্বিত অংশটুকুর সমন্বয় জাবেদা দিতে হবে-

i. সমন্বয়ে আছে, বিজ্ঞাপন খরচের দুই-তৃতীয়াংশ বিলম্বিত রয়েছে। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, বিলম্বিত বিজ্ঞাপন ৬,০০০ টাকা।)

             বিজ্ঞাপন খরচ হিসাব ডেবিট ২,০০০/-

             বিলম্বিত বিজ্ঞাপন খরচ হিসাব ক্রেডিট ২,০০০/-

ii. সমন্বয়ে আছে, বিজ্ঞাপন খরচের দুই-তৃতীয়াংশ বিলম্বিত হয়েছে। (কিন্তু রেওয়ামিলে আছে, বিজ্ঞাপন খরচ ৬,০০০ টাকা।)

               বিলম্বিত বিজ্ঞাপন খরচ হিসাব ডেবিট ৪,০০০/-

               বিজ্ঞাপন খরচ হিসাব ক্রেডিট ৪,০০০/-

১১. সমাপনী মজুদ পণ্যের সমন্বয় দাখিলা-

i. যদি রেওয়ামিলে বিক্রিত পণ্যের ব্যয় বা সমন্বিত ক্রয় না থাকে-

             সমাপনী মজুদপণ্য ডেবিট

             ক্রয় হিসাব ক্রেডিট

ii. রেওয়ামিলে বিক্রিত পণ্যের ব্যয় থাকলে-

             সমাপনী মজুদপণ্য ডেবিট

             বিক্রিত পণ্যের ব্যয় ক্রেডিট

নোট: ১। রেওয়ামিলে সমন্বিত ক্রয় বা বিক্রিত পণ্যের ব্যয় না থাকলে রেওয়ামিলের মজুদ পণ্য হবে প্রারম্ভিক মজুদ। আর সমন্বয়ে যে মজুদ পণ্য থাকবে তা হলো সমাপনী মজুদ। এই সমাপনী মজুদ পণ্যের সমন্বয় দাখিলা-

            সমাপনী মজুদপণ্য ডেবিট

            ক্রয় হিসাব ক্রেডিট

২। কিন্তু, রেওয়ামিলে বিক্রীত পণ্যর ব্যয় বা সমন্বিত ক্রয় থাকলে রেওয়ামিলের মজুদপণ্য হবে সমাপনী মজুদ। এর পরেও যদি সমন্বয়ে সমাপনী মজুদ থাকে, তবে সমন্বয়ের মজুদপণ্যই প্রকৃত সমাপনী মজুদ। তাই সমন্বয় জাবেদার মাধ্যমে difference সমপরিমাণ অর্থের সমন্বয় সমন্বয় জাবেদা দিতে হবে। সমন্বয়ে উল্লেখিত প্রকৃত সমাপনী মজুদপণ্য বড় হলে সমাপনী মজুদ বৃদ্ধির সমন্বয় জাবেদা দিতে হবে-

            সমাপনী মজুদ ডেবিট (difference)

            বিক্রিত পণ্যের ব্যয় ক্রেডিট

আর সমন্বয়ে উল্লেখিত প্রকৃত সমাপনী মজুদপণ্য ছোট হলে সমাপনী মজুদ হ্রাসের সমন্বয় জাবেদা দিতে হবে- (প্রদত্ত জাবেদার উল্টো)

            বিক্রিত পণ্যের ব্যয় ডেবিট

            সমাপনী মজুদ ক্রেডিট (difference)

১২. কোনো লেনদেন লিপিবদ্ধকরণ হতে বাদ পড়ে গেলে তার সঠিক জাবেদা দিলেই সমন্বয় হয়ে যায়।


Comments

Popular posts from this blog

বিসিএস লিখিত হিসাববিজ্ঞানের সিলেবাস

BCS ACCOUNTING SYLLABUS FOR WRITTEN EXAM

ব্যাখ্যাসহ ৪১তম বিসিএসভাইভা অভিজ্ঞতা